আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বহুল ব্যবহৃত তিনটি ওষুধকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার সংস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা IARC উচ্চ রক্তচাপের সাধারণ ওষুধ হাইড্রোক্লোরোথায়াজাইডসহ তিনটি ওষুধকে মানুষের জন্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী (গ্রুপ ১) হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা রোগীদের হঠাৎ ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার বা সংক্ষেপে IARC, সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থাটি বহুল ব্যবহৃত তিনটি ওষুধকে মানুষের জন্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে।
এই তিনটি ওষুধকে রাখা হয়েছে সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণিতে, যাকে বলা হয় গ্রুপ ১। এর অর্থ হলো, এই উপাদানগুলো মানুষের শরীরে ক্যান্সার তৈরি করতে পারে বলে যথেষ্ট ও দৃঢ় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে IARC-এর মনোগ্রাফের ১৩৭তম খণ্ডে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এই ঘোষণার মানে এই নয় যে রোগীদের এখনই আতঙ্কিত হতে হবে বা নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করে দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বরং সতর্ক করেছেন যে হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করা অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে, যে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে নিচে।
কোন তিনটি ওষুধ
প্রথম ওষুধটি হলো হাইড্রোক্লোরোথায়াজাইড, যা উচ্চ রক্তচাপ ও শরীরে পানি জমা কমাতে বহুল ব্যবহৃত একটি ওষুধ। আগে এটি সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী শ্রেণিতে ছিল, কিন্তু এখন একে গ্রুপ ১-এ উন্নীত করা হয়েছে, কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহারের সঙ্গে ত্বকের ক্যান্সারের সম্পর্ক প্রমাণিত হয়েছে।
দ্বিতীয় ওষুধটি হলো ভোরিকোনাজল, একটি শক্তিশালী অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ যা শরীরের মারাত্মক ছত্রাক সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তৃতীয়টি হলো ট্যাক্রোলিমাস, যা মূলত অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর প্রত্যাখ্যান ঠেকাতে এবং একজিমা ও ভিটিলিগোর মতো ত্বকের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়।
কেন এই সিদ্ধান্ত
তিনটি ওষুধের ক্ষেত্রে ক্যান্সার তৈরির পথ আলাদা। হাইড্রোক্লোরোথায়াজাইডের ক্ষেত্রে মূল কারণ হলো আলোক-সংবেদনশীলতা। এই ওষুধ গ্রহণের পর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে অক্সিডেটিভ চাপ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের নন-মেলানোমা ক্যান্সার, বিশেষত স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা ও ঠোঁটের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
ভোরিকোনাজলের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে। এই ওষুধ শরীরে ভেঙে যে উপাদান তৈরি করে, তা সূর্যালোকের সংস্পর্শে ত্বকের কোষের ক্ষতি করে। অন্যদিকে ট্যাক্রোলিমাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়, ফলে অস্বাভাবিক কোষ ধ্বংস করার ক্ষমতা কমে যায় এবং লিম্ফোমা ও ত্বকের ক্যান্সারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়ে।
IARC-এর এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। একটি বিশেষজ্ঞ কার্যদল নানা ধরনের প্রমাণ পর্যালোচনা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে মানুষের ওপর করা মহামারিতত্ত্বীয় গবেষণা, প্রাণীর ওপর চালানো পরীক্ষা এবং শরীরে ওষুধ কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে যান্ত্রিক গবেষণা।
রোগীদের কী করণীয়

এই খবর শুনে অনেক রোগীই উদ্বিগ্ন হতে পারেন, তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এ ক্ষেত্রে খুবই স্পষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, রোগীদের চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া হঠাৎ করে নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসায় যেকোনো পরিবর্তন কেবল চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই করা উচিত।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো তাৎক্ষণিক ও প্রাণঘাতী ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ক্যান্সারের পরিসংখ্যানের তুলনায় অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের বিপদ তাৎক্ষণিকভাবে অনেক বড়।
এর প্রকৃত অর্থ কী
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি পার্থক্য বোঝা দরকার। গ্রুপ ১ শ্রেণিবিন্যাস মূলত বলে যে কোনো উপাদান ক্যান্সার তৈরি করতে সক্ষম কি না, তবে এটি একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ঝুঁকি ঠিক কতটা, তা সরাসরি পরিমাপ করে না। প্রকৃত ঝুঁকি অনেকাংশে নির্ভর করে ওষুধের মাত্রা ও ব্যবহারের সময়কালের ওপর।
তাই বাস্তব পরামর্শ হলো, রোগীরা যেন নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং প্রয়োজনে সূর্যের অতিরিক্ত সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন ও ত্বকের নিয়মিত পরীক্ষা করান। এই ঘোষণা আসলে রোগী ও চিকিৎসকদের আরও সচেতনভাবে ঝুঁকি ও উপকারিতার ভারসাম্য বিবেচনা করার একটি আহ্বান।





