avalw news
আয়েশা রহমানআয়েশা রহমানVIEW PROFILE →

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: ৮৪৯ শিশুর মৃত্যু, টিকাদানে ধসই মূল কারণ

health2026-08-19 · 3 min read · 397 reads

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাবে ৪ আগস্ট পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে ৮৪৯ শিশু মারা গেছে, আক্রান্ত সন্দেহে ১ লাখ ৩১ হাজারের বেশি। এমআর টিকার হার কমে যাওয়া এবং সরবরাহ ঘাটতিই এই কয়েক দশকের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। থিংক গ্লোবাল হেলথের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম মিলিয়ে অন্তত ৮৪৯ শিশু মারা গেছে, যেখানে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৪৬ এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণ ১৬ হাজার ৫৩১। জুন মাসের মধ্যেই দেশের ৬৪টি জেলাতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

এই সংখ্যাগুলো কতটা অস্বাভাবিক, তা বোঝা যায় আগের বছরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে সাধারণত মাত্র ১০০ থেকে ৩০০টি হামের ঘটনা নথিভুক্ত হতো। সেই তুলনায় চলতি বছরের কয়েক হাজার নিশ্চিত সংক্রমণ ও শত শত মৃত্যু নজিরবিহীন, আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাসিক নজরদারিতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪২ হাজার ৭৮০টি ঘটনার তথ্যও উঠে এসেছে।

প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো এর শিকার মূলত শিশুরা। আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী, আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স নয় মাসেরও নিচে। এই কনিষ্ঠতম শিশুরা রুটিন টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি বলে তারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, এবং সমাজে হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা সরাসরি সংক্রমণের মুখে পড়ছে।

টিকাদানে ধস

বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানের হার কমে যাওয়াকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় ডোজের কভারেজ ৯০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, যা হাম ঠেকাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত অন্তত ৯৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক কম। আগে যেখানে হার্ড ইমিউনিটি প্রায় ৯৫ শতাংশ ছিল, তা গত দুই-তিন বছরে দ্রুত ক্ষয়ে গেছে।

সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে টিকার সরবরাহ ঘাটতির কারণে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইউনিসেফের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করতে পেরেছে, যেখানে দেশটির সাধারণ বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭ কোটি ডোজ। এই বিশাল ঘাটতি লাখ লাখ শিশুকে সময়মতো টিকার আওতার বাইরে রেখে দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব

টিকাদান কর্মসূচিতে এই ধসের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতারও ভূমিকা রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন, যা তৎকালীন সরকারের পতন ঘটায়, সেই সময় ও তার পরবর্তী পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়।

সুরক্ষার এই ঘাটতিই দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পথ তৈরি করেছে। টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে হাম সহজেই ছড়িয়ে পড়ে, এবং কয়েক মাসের মধ্যেই তা ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সব বিভাগে পৌঁছে যায়। জুন মাসের মধ্যে ৬৪ জেলার সবগুলোতেই সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া এই দ্রুত বিস্তারেরই প্রমাণ।

প্রতিক্রিয়া ও সতর্কবার্তা

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধের তাক। হাম প্রতিরোধে টিকার সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। (প্রতীকী ছবি)
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধের তাক। হাম প্রতিরোধে টিকার সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। (প্রতীকী ছবি)

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে, যা ২০ এপ্রিল থেকে চালু হয়। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রধান রানা ফ্লাওয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই গণটিকাদান কর্মসূচি প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুর কাছে পৌঁছেছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিকে উচ্চ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে, আর কর্মসূচির পূর্ণ প্রভাব দেখা যেতে কয়েক মাস লেগে যাবে বলে জানানো হয়েছে।

চিকিৎসকরাও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আইনুল ইসলাম খান বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও জটিলতা ছাড়া একটি সুস্থ শিশু সামান্য চিকিৎসাতেই সেরে উঠতে পারে। কিন্তু এখানে বেশিরভাগ শিশু হাসপাতালে এসেছে শ্বাসকষ্ট ও নানা সংক্রমণ নিয়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তাৎপর্য ও করণীয়

এই প্রাদুর্ভাব একটি বড় সতর্কবার্তা বহন করে। হাম এতটাই সংক্রামক যে টিকাদানের হারে সামান্য ধস নামলেও তা কয়েক দশকের অর্জনকে দ্রুত উল্টে দিতে পারে। এর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে টিকার এই ঘাটতি শুধু হাম নয়, বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকেও উন্মোচিত করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।

সামনের দিনগুলোতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে টিকার কভারেজ আবার ৯৫ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া, টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ ক্যাচ-আপ কর্মসূচি চালানো। ৮৪৯ শিশুর মৃত্যুর এই ভারী মূল্য মনে করিয়ে দেয় যে, রুটিন টিকাদান কর্মসূচি রক্ষা করা কেবল স্বাস্থ্য নয়, লাখো শিশুর জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

আয়েশা রহমান
WRITTEN BY THE AUTHOR
আয়েশা রহমান
2026-08-19 · 3 min read · 397 reads
View profile →
VERIFY THIS STORY
ASK AI
MORE FROM আয়েশা রহমান
Report this articlesupport@avalw.com