আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
নীরব বিপদ লবণ: বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের পেছনের অভ্যাস ও তা বদলানোর উপায়
বাংলাদেশে প্রতি পাঁচ জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, আর এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে প্রতিদিনের অতিরিক্ত লবণ। কী বলছে গবেষণা, আর কীভাবে বদলানো যায় এই অভ্যাস।
প্রতিদিনের রান্নাঘরে থাকা একটি সাধারণ উপাদান নীরবে বাংলাদেশের বড় একটি স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, আর সেটি হলো লবণ। উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই বাড়তে থাকে, তাই অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে আছেন। অথচ এই সমস্যাটি এখন দেশজুড়ে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সংখ্যায় সমস্যা
সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ২১ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জনে অন্তত একজন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট, যা প্রতিটি বয়স ও অঞ্চলের মানুষকেই স্পর্শ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অসংক্রামক রোগবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ, যার মধ্যে হৃদরোগ ও স্ট্রোক অন্যতম প্রধান। এই মৃত্যুর একটি বড় অংশ সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে যুক্ত, আর উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় খাদ্যতালিকাগত কারণ হলো অতিরিক্ত লবণ।
সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের প্রতিদিনের লবণ গ্রহণের পরিমাণ। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক গড়ে দিনে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ খান, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত দৈনিক ৫ গ্রামের প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ আমরা শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি লবণ গ্রহণ করছি, প্রতিদিন, বছরের পর বছর।
একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, উচ্চ রক্তচাপ পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে কিছুটা বেশি দেখা যাচ্ছে। জরিপের তথ্য বলছে, নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার প্রায় ২৩ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১৭ শতাংশ। এই ব্যবধান পরিবারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নারীদের প্রতি বাড়তি মনোযোগের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
লবণ কেন এত বিপজ্জনক

লবণের মূল উপাদান সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখে, ফলে রক্তের আয়তন বেড়ে যায় এবং রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ে। দীর্ঘদিন এই বাড়তি চাপ চলতে থাকলে হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও রক্তনালি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবেই অতিরিক্ত লবণ স্ট্রোক, হৃদরোগ ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়।
উচ্চ রক্তচাপকে চিকিৎসকেরা প্রায়ই নীরব ঘাতক বলে থাকেন, আর তা অকারণে নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গুরুতর ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না, তাই বহু মানুষ জানেনই না যে তাঁদের রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে। নিয়মিত রক্তচাপ না মাপলে সমস্যাটি সময়মতো ধরা পড়ে না।
কোথা থেকে আসছে এত লবণ
অনেকে মনে করেন, লবণ কমানো মানে শুধু খাবারের পাতে বাড়তি লবণ না নেওয়া। কিন্তু সমস্যা তার চেয়ে গভীর। আমাদের গ্রহণ করা লবণের একটি বড় অংশ আসে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষিত খাবার, আচার, চিপস ও নোনতা নাশতা, এবং বাইরের রান্না করা খাবার থেকে, যেখানে লবণের পরিমাণ সাধারণত অনেক বেশি থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাস। খাবারের পাতে কাঁচা লবণ ছিটিয়ে নেওয়া, নোনতা আচার ও ভর্তা বেশি খাওয়া অনেক পরিবারেই স্বাভাবিক রীতি। এই অভ্যাসগুলো নিয়ে সচেতনতা এখনো কম, ফলে ক্ষতিটা দিনের পর দিন নিঃশব্দে জমতে থাকে।
গবেষণা আরও দেখিয়েছে, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের প্রবণতা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে বেশি, যেমন গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যাঁদের সদ্য উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়েছে। এর অর্থ, ঝুঁকিটি সমাজের একটি বড় ও বিস্তৃত অংশজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
কীভাবে কমাবেন
ভালো খবর হলো, লবণ কমানো তুলনামূলকভাবে সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী একটি অভ্যাস। প্রথম ধাপ হলো ধীরে ধীরে লবণ কমানো, রান্নায় কম লবণ দেওয়া এবং খাবারের পাতে বাড়তি কাঁচা লবণ একেবারে বাদ দেওয়া। বাড়িতে তাজা উপকরণ দিয়ে রান্না করলে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হয়।
স্বাদের জন্য লবণের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় লেবু, রসুন, আদা, ধনেপাতা ও নানা রকম মসলা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জিভ কম লবণের স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে যায়, ফলে খাবার আর বিস্বাদ মনে হয় না। পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেল দেখে কম সোডিয়ামযুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া একটি কার্যকর অভ্যাস।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাজা শাকসবজি ও ফল বাড়ানোও সাহায্য করে, কারণ এতে থাকা পটাশিয়াম শরীরে সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা ভারসাম্যে আনে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটি হলো নিয়মিত রক্তচাপ মাপানো, কারণ উপসর্গহীন এই সমস্যা কেবল পরিমাপের মাধ্যমেই আগেভাগে ধরা পড়ে।
লবণ কমানোর এই ছোট ছোট পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল বয়ে আনতে পারে। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে দেখলে, লবণ গ্রহণ কমানো হলো হৃদরোগ ও স্ট্রোক ঠেকানোর অন্যতম সস্তা ও কার্যকর উপায়। আর এই পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে প্রতিটি পরিবারের খাবারের টেবিল থেকেই, আজ থেকেই।





