আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে: এ বছর আক্রান্ত প্রায় ১৮ হাজার, মৃত্যু ৫৯, শীর্ষে ঢাকা
চলতি বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ৮৮০ ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। জেনে নিন পরিসংখ্যান ও প্রতিরোধের উপায়।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর আবারও একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ না হতেই দেশজুড়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, আর পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিচ্ছে উদ্বেগ। প্রতিবছরের মতো এবারও এডিস মশাবাহিত এই রোগ নগর ও গ্রাম উভয় জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ৮৮০ জন এবং মারা গেছেন ৫৯ জন। এই সংখ্যা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে সংক্রমণের ধারা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং ওপরের দিকেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক রোগী হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নেন।
সংক্রমণের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৭১ জন এবং মারা গেছেন ২৬ জন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ৪০৪ এবং মৃত্যু ২৫ জন। ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী তাই এবারও ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বরিশাল বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৪৭, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত ৩ হাজার ৮২ জন এবং মৃত্যু ৭ জন, আর খুলনা বিভাগে আক্রান্ত ২ হাজার ২৭২ জন ও মৃত্যু ১২ জন। ময়মনসিংহ বিভাগেও ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে সংক্রমণ এখন শুধু বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই।
কেন বাড়ছে সংক্রমণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট কারণ রয়েছে। ঘনবসতি, শহরের নানা জায়গায় মশার নিরবচ্ছিন্ন বংশবিস্তার এবং প্রতিক্রিয়াশীল বা দেরিতে নেওয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই পরিস্থিতিকে জটিল করছে। এডিস মশা মূলত পরিষ্কার কিন্তু জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে, ফলে বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি তাদের জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেছেন যে এবারের সংক্রমণের চূড়া আগস্টে না-ও আসতে পারে। তাঁর ধারণা, এই বছর ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রকোপ দেখা যেতে পারে সেপ্টেম্বর মাসে। অর্থাৎ সামনের সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, যা এখন থেকেই সতর্কতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
৮ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১৭ হাজার ৮৮০ জন, মৃত্যু ৫৯, যার মধ্যে শীর্ষে ঢাকা বিভাগ।
প্রতিরোধে করণীয়
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো সংক্রমণ কম থাকা সময়েও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার রাখা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জিএম সাইফুর রহমান একটি জাতীয় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ না নিলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হলো বাড়ির ভেতরে ও চারপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, বালতি, এসি বা ফ্রিজের নিচে জমা পানি এবং ছাদের কোণে জমে থাকা বৃষ্টির পানি এডিস মশার নিরাপদ আশ্রয়। সপ্তাহে অন্তত এক দিন এসব জায়গা পরিষ্কার করে পানি ফেলে দিলে মশার বংশবিস্তার অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।
এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকালে ও বিকেলে কামড়ায়, তাই কেবল রাতের সুরক্ষার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। দিনের বেলাতেও শরীর ঢেকে রাখে এমন হালকা রঙের পূর্ণ হাতা পোশাক পরা, মশা তাড়ানোর ক্রিম বা রিপেলেন্ট ব্যবহার করা এবং শিশুরা যেন দিনে মশারির নিচে ঘুমায় তা নিশ্চিত করা জরুরি। ঘরের দরজা-জানালায় নেট ব্যবহার করলেও সুরক্ষা বাড়ে।
উপসর্গের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। হঠাৎ তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে ব্যথা কিংবা র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকরা সাধারণত জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খেতে বলেন এবং অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন, কারণ এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি, ডাবের পানি, স্যালাইন ও পুষ্টিকর তরল খাবার শরীরে পানিশূন্যতা রোধ করে এবং দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। রোগীর প্লেটলেট বা রক্তের অবস্থা যেন সময়মতো পরীক্ষা করা হয়, সেদিকেও পরিবারের খেয়াল রাখা দরকার।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের পরিসংখ্যান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার ও নাগরিক উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মশা নিয়ন্ত্রণে টেকসই ব্যবস্থা এবং ঘরে ঘরে সচেতনতা ছাড়া সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য চূড়া সামলানো কঠিন হবে। প্রতিটি পরিবার যদি এখন থেকেই সতর্ক হয়, তবেই এই মৌসুমে প্রাণহানি ও ভোগান্তি কমিয়ে আনা সম্ভব।





