আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বায়ু দূষণের নতুন বিপদ: গবেষণা বলছে ঢাকার দূষিত বাতাস বাড়াচ্ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও
একটি নতুন গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে সূক্ষ্ম বায়ুকণা পিএম২.৫-এর সংস্পর্শ বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাতাসের মান লক্ষ্যমাত্রায় আনতে পারলে দেশে ডায়াবেটিসের বোঝা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে।
বায়ু দূষণকে আমরা সাধারণত শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে ভাবি। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা দেখাচ্ছে, দূষিত বাতাসের বিপদ কেবল ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শরীরের গভীরে পৌঁছে বিপাকক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। সাম্প্রতিক এই গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ু দূষণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।
গবেষণাটি বেশ বড় পরিসরে পরিচালিত হয়েছে, যা এর ফলাফলকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলে। এতে দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক ১৩ হাজার ৯৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই তথ্য নেওয়া হয়েছে ২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে থেকে। এত বড় নমুনার ওপর ভিত্তি করে করা বিশ্লেষণ সাধারণত পুরো জনগোষ্ঠীর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
গবেষণার মূল ফল স্পষ্ট এবং উদ্বেগজনক। দীর্ঘমেয়াদে সূক্ষ্ম বায়ুকণা, যা পিএম২.৫ নামে পরিচিত, তার সংস্পর্শে থাকা মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার বেশি দেখা গেছে। অর্থাৎ যে এলাকার বাতাসে দূষণ যত বেশি, সেখানকার বাসিন্দাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও তত বেশি হতে পারে। এটি বায়ু দূষণকে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে সামনে আনছে।
ঢাকার বাতাস কতটা খারাপ

এই গবেষণার তাৎপর্য বুঝতে হলে ঢাকার বাতাসের প্রকৃত অবস্থা জানা জরুরি। ২০২৫ সালে ঢাকার বাতাসে পিএম২.৫-এর গড় পরিমাণ ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নিরাপদ সীমা, অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের চেয়ে প্রায় ১৩.৬ গুণ বেশি। এত উচ্চ মাত্রার দূষণ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিস্থিতি আগের বছরে আরও খারাপ ছিল। ২০২৪ সালে ঢাকার বাতাসে পিএম২.৫-এর গড় পরিমাণ ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৮ মাইক্রোগ্রাম, যা নিরাপদ সীমার প্রায় ১৫.৬ গুণ। সে বছর দূষণের বিচারে ঢাকা ছিল বিশ্বের ২৬তম সবচেয়ে দূষিত শহর, আর বাংলাদেশ চিহ্নিত হয়েছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত দেশ হিসেবে। ২০২৬ সালেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
এই দূষণের উৎস মূলত মানুষের কর্মকাণ্ড। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাতাসে থাকা পিএম২.৫-এর প্রায় ৯০ শতাংশই আসে বিভিন্ন মনুষ্যসৃষ্ট উৎস থেকে। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার কার্যক্রম, ডিজেলচালিত জেনারেটর, কাঠ ও জৈব জ্বালানি পোড়ানো এবং ধুলাবালি। এসব উৎস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাতাসের মানে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
গবেষণা বলছে, বাতাসের মান জাতীয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রায় আনতে পারলে দেশে ডায়াবেটিসের বোঝা ৪.৬ থেকে ৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
দূষণ ও ডায়াবেটিসের সম্পর্ক
সূক্ষ্ম বায়ুকণা কীভাবে ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, সেই ব্যাখ্যাও বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। পিএম২.৫ এতই ক্ষুদ্র যে তা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুস পেরিয়ে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। গবেষকদের ধারণা, এই কণা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে, যা ডায়াবেটিসের পথ প্রশস্ত করে।
এই আবিষ্কার জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস এমনিতেই বাংলাদেশে দ্রুত বেড়ে চলা একটি অসংক্রামক রোগ। এত দিন এর প্রধান কারণ হিসেবে খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করা হতো। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, বায়ু দূষণও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যা এত দিন অনেকটাই উপেক্ষিত ছিল।
কী করা যায়
সবচেয়ে বড় সমাধানটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। গবেষণা অনুযায়ী, বাতাসের মান উন্নত করা কেবল শ্বাসতন্ত্র নয়, ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও সহায়ক হতে পারে। ইটভাটার আধুনিকায়ন, যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বহু ধরনের রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
ব্যক্তি পর্যায়েও কিছু সতর্কতা কাজে আসে। দূষণ বেশি থাকা দিনগুলোতে বাইরে বের হলে মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করা, বাতাসের মান সূচক দেখে চলাফেরার পরিকল্পনা করা এবং ঘরের ভেতরের বাতাস পরিচ্ছন্ন রাখা সহায়ক। রান্নার জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার এবং ঘরে ধোঁয়া কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা কখনোই সামগ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়।
সব মিলিয়ে এই গবেষণা একটি বড় বার্তা দিচ্ছে, বায়ু দূষণ কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সংকট। পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করা মানে একই সঙ্গে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়িত দেশে এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি এখন সময়ের দাবি। বাতাস পরিষ্কার হলে লাভবান হবে গোটা জনস্বাস্থ্য।





