আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব: বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে এবং জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজারের বেশি মানুষ। একই সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু আবারও দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে নিরন্তর তৎপর থাকতে হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের সংক্রমণের চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৩১ জুলাই পর্যন্ত এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩১০ জনে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৫৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও তিনজন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো জুলাই মাসে সংক্রমণের আকস্মিক লাফ। এই এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ২০৬ জন মানুষ। অথচ তার আগের মাস জুনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৯০৭ জন। এপ্রিল মাস থেকেই প্রতি মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে।
মৃত্যুর সংখ্যা ও সতর্কতা
সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমশ ভারী হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ বছর মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই মারা গেছেন ৩৬ জন রোগী। আগের মাস জুনে এই সংখ্যা ছিল ১৩ জন, যা মাসিক ভিত্তিতে তীব্র বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়।
পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ আগাম সতর্কতা জারি করেছে। দেশের অন্তত ১৪টি জেলায় উচ্চ ঝুঁকির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় মশা নিধন ও নজরদারি কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩১ জুলাই পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩১০ জনে।
সংক্রমণের ভৌগোলিক বিস্তারও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে সংখ্যাটি ৩ হাজার ২ জন। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ২৭০ জন আক্রান্ত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১ হাজার ৮৬৯ জন এবং খুলনায় ১ হাজার ৬৮৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
কারণ ও প্রেক্ষাপট

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋতুভিত্তিক আবহাওয়াই এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টিপাত এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেই এই মশা সবচেয়ে দ্রুত বংশ বিস্তার করে। ফলে বছরের এই সময়টিতে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
ইতিহাস বলছে, ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য একটি বার্ষিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। গত ২০২৫ সালে দেশে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন মানুষ। সেই বছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪১৩ জন রোগী। এই পরিসংখ্যান বছরের পর বছর সমস্যাটির ভয়াবহতাই তুলে ধরে।
এই সংকট কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রতিবেদন এ কথাই বলছে। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডসহ একাধিক দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, মশাবাহিত এই রোগ পুরো অঞ্চলের জন্যই এক বড় হুমকি।
হামের প্রাদুর্ভাব
ডেঙ্গুর পাশাপাশি আরেকটি রোগ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। দেশে একই সময়ে হামের একটি বড় প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। ১৫ মার্চের পর থেকে হামে আক্রান্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার।
প্রতিরোধ ও করণীয়
এই দ্বৈত সংকট মোকাবিলায় সচেতনতা ও প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। মশারি ও প্রতিরোধক ব্যবহার এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।





