আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে: এ বছর মৃত্যু ৫৯, আক্রান্ত প্রায় ১৮ হাজার, চূড়া আসতে পারে সেপ্টেম্বরে
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। ৮ আগস্ট পর্যন্ত এ বছর ৫৯ জন মারা গেছেন এবং প্রায় ১৭ হাজার ৮৮০ জন আক্রান্ত হয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকোপের চূড়া সেপ্টেম্বরে আসতে পারে।
বাংলাদেশ আবারও ডেঙ্গুর প্রকোপের মুখোমুখি, আর এবারের পরিসংখ্যান ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৬ সালে এই রোগ ইতিমধ্যে অনেক প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে আক্রান্ত করেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সবচেয়ে খারাপ সময়টি এখনও সামনে আছে। প্রতি বছরের মতো এবারও বর্ষা মৌসুম মশাবাহিত এই রোগকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৮ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৫৯ জন এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ৮৮০ জন। সংখ্যাগুলো থামার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না, বরং প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা তাই আরও বড় ধাক্কার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এই ঊর্ধ্বগতি গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।
ঢাকা সবচেয়ে বিপর্যস্ত
আক্রান্তের মানচিত্রে সবচেয়ে ওপরে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ৬ হাজার ৮৭১ জন আক্রান্ত এবং ২৬ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই আক্রান্ত ৪ হাজার ৪০৪ জন এবং মৃত্যু ২৫ জন, যা রাজধানীর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এরপরই রয়েছে বরিশাল বিভাগ, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৪৭। চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৮২ জন আক্রান্ত ও ৭ জনের মৃত্যু এবং খুলনায় ২ হাজার ২৭২ জন আক্রান্ত ও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকায় এই কেন্দ্রীভূত প্রকোপের পেছনে রয়েছে ঘন জনবসতি এবং শহরের পরিবেশ, যা ডেঙ্গু ছড়ানো মশার জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, যা নগর এলাকায় সহজেই পাওয়া যায়। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের জমা পানি হয়ে ওঠে মশার আঁতুড়ঘর। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকোপের চূড়া এখনও আসেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, এবার আগস্টে নয়, বরং সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর চূড়া আসতে পারে। তাঁর মতে, আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ সামনের সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এই ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ হাসপাতালগুলোর ওপর মারাত্মক বোঝা তৈরি করছে। মৌসুমের এই সময়ে ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায় এবং চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। গুরুতর রোগীদের জন্য শয্যা, রক্ত ও নিবিড় পরিচর্যার চাহিদাও একসঙ্গে বেড়ে যায়। ফলে একটি দীর্ঘ মৌসুম গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহনশীলতাকে পরীক্ষা করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, এবার ডেঙ্গুর চূড়া আগস্টে নয়, সেপ্টেম্বরে আসতে পারে।
নিয়ন্ত্রণহীন সংকট

বিশেষজ্ঞরা এই প্রকোপের জন্য মূলত কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন। ঘন জনবসতি, মশার নিরবচ্ছিন্ন প্রজনন এবং আগে থেকে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রকোপ শুরুর পর প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ নেওয়াই পরিস্থিতিকে জটিল করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিএম সাইফুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, একটি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। অর্থাৎ সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
এই মুহূর্তে প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ঘরের ভেতরে ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত ফেলে দেওয়া, ফুলের টব ও পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং নির্মাণস্থলের জমা পানি অপসারণ মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকাতে জরুরি। পাশাপাশি মশারি ব্যবহার, মশা তাড়ানোর উপকরণ এবং শরীর ঢেকে রাখা পোশাকও কামড় থেকে সুরক্ষা দেয়। সরকারি স্প্রে কার্যক্রমের মতোই ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের সচেতন ভূমিকা এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু দ্রুত গুরুতর রূপ নিতে পারে বলে বিপদচিহ্ন চেনা অত্যন্ত জরুরি। প্রবল জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি এবং শরীরের কোথাও রক্তক্ষরণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে। সঠিক সময়ে হাসপাতালে যাওয়াই অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু ঠেকানোর মূল উপায়।
সব মিলিয়ে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জন্য কেবল মৌসুমি ঝামেলা নয়, বরং প্রতিবছর ফিরে আসা এক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মশা নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি একসঙ্গে এই সংকটকে বছরের পর বছর গভীর করছে। সেপ্টেম্বরে চূড়ার আশঙ্কা থাকায় সামনের সপ্তাহগুলো দেশের হাসপাতাল ও মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের বার্তা স্পষ্ট, সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপ ছাড়া এই সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।





