আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
চন্দ্রবোড়ার আতঙ্ক: বাংলাদেশে সাপের কামড় কেন এক বড় স্বাস্থ্যসংকট, আর অ্যান্টিভেনম কেন যথেষ্ট নয়
গ্রামীণ বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়াসহ বিষধর সাপের কামড় এক নীরব অথচ প্রাণঘাতী সংকট। কেন প্রতি বছর হাজারো মানুষ মারা যায়, অ্যান্টিভেনম কেন যথেষ্ট নয়, আর কীভাবে বাঁচা যায়।
বায়ুদূষণ কিংবা ডায়াবেটিসের মতো রোগ নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, সাপের কামড় নিয়ে ততটা হয় না। অথচ গ্রামীণ বাংলাদেশে এটি এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ প্রাণঘাতী সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চন্দ্রবোড়ার মতো বিষধর সাপের পুনরুত্থান কৃষক ও জেলেদের জীবনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, যাদের প্রতিদিনের কাজই তাদের এই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
বছরে হাজারো প্রাণহানি
পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণার আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সাপের কামড়ে প্রায় ছয় হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এদের বড় অংশই গ্রামের কৃষক ও জেলে, যারা মাঠে বা পানিতে কাজ করার সময় সাপের মুখোমুখি হন। তবু বিষয়টি বহুদিন ধরে অনেকটাই অবহেলিত একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেই থেকে গেছে।
চন্দ্রবোড়ার প্রত্যাবর্তন

একসময় প্রায় হারিয়ে যাওয়া চন্দ্রবোড়া সাপ ২০১৩ সালের পর থেকে আবার ফিরে এসেছে এবং দেশের অনেক জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারা বছর সেচ ও চাষাবাদ বেড়ে যাওয়ায় এই সাপের সংখ্যা বাড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে নানা ভুল ধারণা আর অতিরঞ্জিত তথ্যও ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অ্যান্টিভেনমের সংকট
সবচেয়ে বড় সমস্যা চিকিৎসা নিয়েই। বাংলাদেশে সাধারণত আমদানি করা ভারতীয় পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়, যা এ দেশের চন্দ্রবোড়ার বিষের বিরুদ্ধে পুরোপুরি কার্যকর নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চন্দ্রবোড়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যান্টিভেনম নেওয়ার পরও মারা গেছেন। এই সংকট কাটাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেশীয় নির্দিষ্ট অ্যান্টিভেনম তৈরির চেষ্টা করছেন।
বাঁচার উপায় ও করণীয়
সাপে কাটলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই জীবন বাঁচায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখতে হবে, কামড়ানো অঙ্গটি নড়াচড়া না করে স্থির রাখতে হবে এবং দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট করা, ক্ষতস্থান কাটা কিংবা শক্ত করে বাঁধন দেওয়ার মতো পুরনো ভুল পদ্ধতিগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি।
মূল বার্তাটি হলো, সাপের কামড় প্রতিরোধযোগ্য এবং সঠিক চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। মাঠে কাজ করার সময় জুতা পরা, রাতে চলাচলে আলো ব্যবহার আর ঘরবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার মতো সহজ অভ্যাস ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে কার্যকর দেশীয় অ্যান্টিভেনম আর শক্তিশালী গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত হলে এই অবহেলিত সংকটকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।






