আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি: বাংলাদেশের জাতীয় কৌশল আর প্রতিরোধের পথ
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন মৌসুমি উপদ্রব নয়, বরং এক গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। ভয়াবহ পরিসংখ্যান, ডায়াবেটিসের সঙ্গে দ্বৈত ঝুঁকি এবং জাতীয় কৌশল নিয়ে একটি শান্ত পর্যালোচনা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিয়ে যাঁরা নিয়মিত খোঁজ রাখেন, তাঁদের কাছে ডেঙ্গু আর নিছক মৌসুমি উপদ্রব নয়, বরং এক গুরুতর ও পুনরাবৃত্ত জনস্বাস্থ্য সংকট। প্রতি বর্ষায় এডিস মশাবাহিত এই রোগ নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায় এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিষয়টি অতিরঞ্জন ছাড়াই, শান্তভাবে এবং তথ্যের আলোকে বোঝা জরুরি বলে আমি মনে করি।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান
সংখ্যাগুলোই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে দেয়। ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাব ছিল বিশেষভাবে বিধ্বংসী, যেখানে তিন লাখ একুশ হাজারের বেশি আক্রান্ত এবং এক হাজার সাতশোর বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। শুধু জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়েই আক্রান্ত হন প্রায় দুই লাখ তিন হাজার মানুষ, যা ২০১৯ সালের পুরো বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই ঊর্ধ্বগতি সত্যিই উদ্বেগজনক।
ডেঙ্গু ও ডায়াবেটিসের দ্বৈত ঝুঁকি
নতুন করে যে চ্যালেঞ্জটি সামনে আসছে, তা হলো ডেঙ্গুর সঙ্গে ডায়াবেটিসের মতো রোগের সহাবস্থান। ২০২২ সালের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় ডায়াবেটিসকে হাসপাতালে ভর্তির অন্যতম বিবেচ্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এমন রোগীদের ঠিক কীভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা করতে হবে, তার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা এখনো পর্যাপ্ত নয়, যা চিকিৎসকদের জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি করছে।
জাতীয় কৌশল
এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিকল্পনাও এগিয়েছে। বাংলাদেশ একটি জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রণয়ন করেছে, যার মেয়াদ ২০২৪ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিত। কৌশলটি কেবল চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ না থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে বহুমুখী ও সমন্বিত পথে এগোনোর কথা বলছে।
প্রতিরোধই মূল চাবিকাঠি
যত পরিকল্পনাই থাকুক, দিনের শেষে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। এডিস মশার বংশবিস্তারের উৎস, অর্থাৎ জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত অপসারণ করাই প্রথম ও প্রধান কাজ। এর সঙ্গে দরকার সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ, লক্ষণ দেখা মাত্র দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং সঠিক তথ্য জানা। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল এই লড়াইয়ে জেতা সম্ভব।
আমার ভাবনা
আমি মনে করি, ডেঙ্গুকে প্রতি বছরের অনিবার্য দুর্ভোগ হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার। জাতীয় কৌশল কাগজে যত ভালোই হোক, এর প্রকৃত পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে ও ধারাবাহিকতায়। আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা ও নিয়মিত ছোট ছোট অভ্যাসই আমাদের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। এই বিষয়ে আশাবাদী থাকার যথেষ্ট কারণ আছে, যদি আমরা গা-ছাড়া মনোভাব ত্যাগ করি।






