আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয়: এইচপিভি টিকায় ৯৩ শতাংশ কিশোরী সুরক্ষিত
ডেঙ্গু ও অসংক্রামক রোগের সংকটের ভিড়ে বাংলাদেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সাফল্য প্রায় চাপা পড়ে গেছে। ৫৬ লাখ কিশোরীকে এইচপিভি টিকা দিয়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে দেশটি ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সংবাদ প্রায়ই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, বায়ুদূষণ কিংবা ডায়াবেটিসের মতো ক্রমবর্ধমান সংকট নিয়েই আবর্তিত হয়। কিন্তু এই উদ্বেগজনক শিরোনামগুলোর ভিড়ে একটি বিশাল এবং আশাব্যঞ্জক জনস্বাস্থ্য সাফল্য অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে, যা দেশের নারীদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
এই সাফল্যটি হলো জরায়ুমুখ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে পরিচালিত এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি। জরায়ুমুখ ক্যান্সার বাংলাদেশে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য, আর একটি সাধারণ টিকার মাধ্যমেই এই মরণব্যাধির ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে প্রমাণিত হয়েছে।
রেকর্ড টিকাদান কর্মসূচি

এই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৬২ লাখ কিশোরীকে টিকার আওতায় আনা। গ্যাভি, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট ও রংপুর বিভাগজুড়ে এটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কর্মসূচিটি ধাপে ধাপে এগিয়েছে এবং প্রথম ধাপের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই এর বিস্তৃতি ঘটেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ঢাকা বিভাগে পরিচালিত প্রথম ধাপে ১৫ লাখেরও বেশি কিশোরীকে সুরক্ষা দেওয়া হয়, আর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এর অসাধারণ সাফল্যের হার। এই কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ৫৬ লাখ কিশোরী, অর্থাৎ ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের প্রায় ৯৩ শতাংশ টিকার আওতায় এসেছে, যাদের মধ্যে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মেয়েরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্থায়ী কর্মসূচিতে রূপান্তর
এককালীন এই বিশাল অভিযানকে টেকসই করার জন্য কর্তৃপক্ষ দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাপক এই ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর এইচপিভি টিকাকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রজন্মের কিশোরীও এই সুরক্ষার আওতায় আসতে পারে।
এখন থেকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী এবং শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা ১০ বছর বয়সী কিশোরীরাও নিয়মিতভাবে এই টিকা পাবে। এই সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নিশ্চিত করে যে সুবিধাবঞ্চিত এবং স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েরাও যেন এই জীবনরক্ষাকারী সুরক্ষা থেকে বাদ না পড়ে।
একটি মাত্র ডোজের কৌশল গ্রহণ করাও ছিল একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত। এটি টিকাদানকে সহজ ও দ্রুততর করেছে এবং সীমিত সম্পদের একটি দেশে এত বিপুলসংখ্যক কিশোরীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব করেছে, যা সমগ্র উদ্যোগটির লজিস্টিক সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টা কেবল দেশের ভেতরেই প্রশংসিত হয়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৬ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ স্বাস্থ্য সমন্বয় ফোরামে উপস্থাপিত একটি সংকলনে দেশব্যাপী এই একক-ডোজ এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।
এই অর্জন প্রমাণ করে যে সীমিত সম্পদ নিয়েও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে বড় জনস্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূলের পথে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা লাখ লাখ পরিবারের জন্য এক নীরব অথচ গভীর আশার বার্তা বয়ে এনেছে।






