আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
নীরব মহামারি ডায়াবেটিস: বাংলাদেশে কেন বাড়ছে আর কীভাবে সহজ অভ্যাসে ঠেকানো যায়
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় এক কোটি চল্লিশ লাখ ছুঁয়েছে। কেন এই নীরব মহামারি বাড়ছে, আর প্রতিদিনের কোন সহজ অভ্যাসে তা ঠেকানো যায়, তা তুলে ধরা হলো।
আমরা প্রায়ই বড় বড় সংক্রামক রোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি, কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক এই মুহূর্তে নীরবে আরও একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট ছড়িয়ে পড়ছে, যার নাম ডায়াবেটিস, আর এটি এমন এক রোগ যা কোনো শব্দ না করেই ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধে।
বিশেষজ্ঞরা একে অনেক সময় নীরব ঘাতক বলে অভিহিত করেন, কারণ বহু মানুষ জানতেই পারেন না যে তাদের শরীরে রোগটি ইতিমধ্যে বাসা বেঁধেছে, অথচ সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি হৃদরোগ, কিডনি বিকল এমনকি অন্ধত্বের মতো নানা মারাত্মক জটিলতা ডেকে আনতে পারে।
উদ্বেগজনক সংখ্যাগুলো
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ কুড়ি থেকে ঊনআশি বছর বয়সী ডায়াবেটিস আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা ২০০০ সালের মাত্র আঠারো লাখ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি ঊনচল্লিশ লাখে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ২০১১ সালের সাড়ে দশ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে হয়েছে প্রায় তেরো দশমিক দুই শতাংশ, আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যা দুই কোটি ত্রিশ লাখ ছুঁতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে কেবল ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান, অর্থাৎ এই বিশাল অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে আমাদের এই তুলনামূলক ছোট্ট দেশটিতেই।
কেন এত বিপজ্জনক
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো, ২০২৪ সালে দেশের ডায়াবেটিস আক্রান্তদের প্রায় ঊনচল্লিশ শতাংশ মানুষ জানতেনই না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন, ফলে বিনা চিকিৎসায় দিনের পর দিন নীরবে তাদের শরীরের নানা অঙ্গের ক্ষতি হতে থাকে।
এই অবহেলার মূল্য কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট দিয়ে মেটে না, কারণ শুধু ২০২৪ সালেই ডায়াবেটিসজনিত নানা জটিলতায় দেশে প্রায় একত্রিশ হাজার ছয়শ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আর এর চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় একশ তিন কোটি ডলারের বিশাল অঙ্ক।
এত বিপুল অর্থ ব্যয় ও প্রাণহানি একটি পরিবার এবং সেই সঙ্গে গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষত এমন একটি দেশে যেখানে স্বাস্থ্যসেবার সম্পদ এমনিতেই সীমিত এবং এখনো বহু সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
সহজ অভ্যাসেই প্রতিরোধ

তবে সবচেয়ে আশার কথা হলো, টাইপ টু ডায়াবেটিস নামে পরিচিত সবচেয়ে সাধারণ ধরনটি অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য, আর এর জন্য জীবনে বিশাল কোনো পরিবর্তন নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে।
চিনি ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে বেশি করে শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটা বা হালকা শারীরিক পরিশ্রম করা এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই রোগের ঝুঁকি অনেকখানি কমিয়ে দিতে পারে।
সবশেষে সবচেয়ে জরুরি পরামর্শটি হলো নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করানো, কারণ যত আগে রোগ ধরা পড়বে তত সহজে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, আর এই সচেতনতা ও সামান্য যত্নই এই নীরব মহামারির বিরুদ্ধে আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।






