আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
ঢাকার বিষাক্ত বাতাস আর আপনার ফুসফুস: বায়ুদূষণ থেকে সুস্থ থাকার সহজ উপায়
ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় বারবার উঠে আসছে, আর এর প্রভাব পড়ছে আমাদের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে। সহজ ভাষায় জানাচ্ছি বায়ুদূষণের আসল ঝুঁকি আর প্রতিদিনের কিছু ছোট অভ্যাস, যা দিয়ে নিজেকে ও পরিবারকে একটু হলেও সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।
আমরা প্রতিদিন যে বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, তা নিয়ে খুব একটা ভাবি না, অথচ ঢাকার মতো শহরে এই বাতাসই এখন নীরবে আমাদের স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তাই ভালো থাকার প্রথম ধাপ হলো এই অদৃশ্য শত্রুটিকে ঠিকভাবে চিনে নেওয়া।
পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগজনক, কারণ চলতি বছরের ছয় মার্চে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় উঠে আসে, যখন এর বায়ুমান সূচক বা একিউআই দুইশ ছিয়াশিতে পৌঁছে যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর একটি মাত্রা বলে বিবেচিত হয়।
কেন ঢাকার বাতাস এত খারাপ
এই দূষণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, কলকারখানার বর্জ্য, নির্মাণকাজের ধুলা, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দূষণ এবং খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ানো, এই সবকিছু মিলে ঢাকার বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে, বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতের মাসগুলোতে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক উপাদানটির নাম পিএম টু পয়েন্ট ফাইভ, যা এতটাই ক্ষুদ্র কণা যে তা সহজেই ফুসফুসের গভীরে এমনকি রক্তেও ঢুকে যেতে পারে, আর ঢাকায় এর বার্ষিক গড় প্রায় নব্বই মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার প্রায় বিশ গুণ বেশি।
এই সংখ্যাগুলো শুধু কাগজের হিসাব নয়, কারণ গবেষণা বলছে ঢাকার মতো ভারী দূষিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ গড়ে ছয় দশমিক আট বছরের বেশি আয়ু হারাতে পারেন, আর কোনো কোনো এলাকায় এই ক্ষতি আট দশমিক এক বছর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ।
শরীরের ওপর দূষণের প্রভাব

স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দূষণের সংস্পর্শে হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসতন্ত্রের নানা সমস্যা শুরু হতে পারে কিংবা আরও বেড়ে যেতে পারে, আর একই সঙ্গে এটি হৃদযন্ত্রের সমস্যাকেও ঘনীভূত করে তোলে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন।
এই ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়, কারণ শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তারা এই দূষিত বাতাসে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন, তাই পরিবারের এই সদস্যদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভালো খবর হলো, পুরো শহরের বাতাস আমরা একা বদলাতে না পারলেও, প্রতিদিনের কিছু ছোট অভ্যাস দিয়ে নিজেদের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারি, আর এখানেই সচেতনতা ও সামান্য পরিকল্পনা আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু হয়ে উঠতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রতিদিন সুস্থ থাকার সহজ উপায়
প্রথম পরামর্শটি খুব সহজ, ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মোবাইলে আজকের বায়ুমান সূচক দেখে নিন, আর দূষণ বেশি থাকলে বাইরে হাঁটা বা ব্যায়ামের সময়টা এমনভাবে বেছে নিন যেন সকালের বা সন্ধ্যার সবচেয়ে দূষিত ব্যস্ত সময়টা এড়িয়ে চলতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, দূষণ বেশি থাকলে ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার করুন, ঘরের জানালা কেবল অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার সময়েই খুলুন, ঘরে সবুজ গাছ রাখুন এবং সম্ভব হলে বায়ু পরিশোধক ব্যবহার করুন, কারণ আমরা দিনের বড় একটা সময় ঘরের ভেতরেই কাটাই।
শেষ কথাটি হলো, শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, ভিটামিন সমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল খান এবং কোনো রকম দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কারণ ছোট ছোট এই যত্নগুলোই দিনশেষে ভালো থাকার আসল চাবিকাঠি।






