আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
ডেঙ্গুর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ লড়াই: ২০২৬ সালে জলবায়ু, নগরায়ণ আর জনস্বাস্থ্যের সংকট
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, বাংলাদেশে এটি সারা বছরের এক স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকট। জলবায়ু, দ্রুত নগরায়ণ আর দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা কীভাবে এই সংকট গভীর করছে, তা তুলে ধরা হলো।
একসময় বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে মূলত বর্ষাকালের একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু সেই দিন এখন অতীত, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই রোগ দেশে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে এবং সারা বছর ধরে সতর্ক থাকার দাবি রাখা এক গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে কয়েকটি সংখ্যাই যথেষ্ট, কারণ ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড সংখ্যক তিন লাখ একুশ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, আর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালেও এই সংখ্যা এক লাখের ওপরে থেকে গেছে, যা সংকটের ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে।
সংখ্যার পেছনের বাস্তবতা

এই শুকনো পরিসংখ্যানের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো পরিবারের কষ্ট ও উদ্বেগের গল্প, কারণ প্রতিটি সংখ্যার অর্থ হলো একজন অসুস্থ মানুষ, একটি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পরিবার এবং প্রায়ই একটি হাসপাতালের বিছানার জন্য মরিয়া লড়াই, বিশেষ করে প্রাদুর্ভাবের তীব্র মৌসুমে।
২০১৯ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং এরপর ২০২৩ সালের রেকর্ড ভাঙা মহামারি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ডেঙ্গু আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি এমন একটি পুনরাবৃত্ত হুমকি যা প্রতি বছর ফিরে এসে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করছে।
মৃত্যুর হারের দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, কারণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন তুলনামূলকভাবে দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং উচ্চমাত্রার দূষণসম্পন্ন নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ডেঙ্গুতে প্রাণহানির ঝুঁকি বেশি থাকে, আর বাংলাদেশ দুর্ভাগ্যবশত এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অনেকটাই বহন করে।
এক নিখুঁত ঝড়
বিশেষজ্ঞরা এই সংকটকে বর্ণনা করছেন এক নিখুঁত ঝড় হিসেবে, যেখানে একাধিক প্রতিকূল উপাদান একসঙ্গে মিলিত হয়ে মশাবাহিত এই রোগের বিস্তারকে অভূতপূর্বভাবে সহজ করে তুলেছে, আর এর মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে সামাজিক নানা বাস্তবতা।
উষ্ণায়ন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ুগত পরিবর্তন এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে, আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি এবং ত্রুটিপূর্ণ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যা মশার প্রজননক্ষেত্র বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে কীটনাশকের প্রতি মশার ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধক্ষমতা এবং জনসচেতনতার অভাব, যার ফলে প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো আগের মতো কার্যকর থাকছে না এবং সংকট মোকাবিলা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সামনের পথ
আশার কথা হলো, প্রযুক্তিও এই লড়াইয়ে যুক্ত হচ্ছে, কারণ গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত পরিসংখ্যানগত মডেল ব্যবহার করে জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গুর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, যাতে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা একমত যে শুধু চিকিৎসা বা প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়, বরং টেকসই নজরদারি, নমনীয় প্রাদুর্ভাব প্রস্তুতি, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পদক্ষেপ, এমনকি বায়ুর মান উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকেও একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য ডেঙ্গু এখন নিছক একটি রোগ নয়, বরং জলবায়ু, নগরায়ণ ও জনস্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসা একটি জাতীয় পরীক্ষা, আর ২০২৬ সাল এই দীর্ঘ লড়াইয়ে দেশটি কতটা প্রস্তুত, তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।






