আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
নীরব যন্ত্রণা: বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের ৯৪ শতাংশ চিকিৎসা-শূন্যতা কেন উদ্বেগের
শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতাও বাস্তব, কিন্তু বাংলাদেশে মানসিক সমস্যায় ভোগা প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ কোনো চিকিৎসাই পান না। জাতীয় জরিপের তথ্য, সামাজিক কুসংস্কার আর কবিরাজের কাছে ছুটে যাওয়ার প্রবণতা,এই নীরব সংকটের গভীরে এক অনুসন্ধান।
আমরা প্রায়ই শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে আজও সংকোচ বোধ করি। অথচ ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতোই বিষণ্নতা বা উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যাগুলোও সমান বাস্তব এবং চিকিৎসাযোগ্য। বাংলাদেশে এই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রটি এক গভীর ও নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
উদ্বেগজনক চিকিৎসা-শূন্যতা
এই সংকটের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে চিকিৎসা-শূন্যতার পরিসংখ্যানে, যাকে ইংরেজিতে ট্রিটমেন্ট গ্যাপ বলা হয়। বাংলাদেশে এই শূন্যতা এতটাই প্রকট যে তা প্রায় ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে অনুমান করা হয়। এর অর্থ হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের বিশাল একটি অংশ কোনো ধরনের চিকিৎসা বা সহায়তার আওতায় আসতেই পারছেন না, যা এক গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের কারণ।
সংখ্যার দিক থেকে বিষয়টিকে আরও ভেঙে দেখলে চিত্রটি আরও হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দেখা যায়, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা প্রায় ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষই কোনো ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পান, বাকিরা থেকে যান চিকিৎসার বাইরে।

জাতীয় জরিপ যা বলছে
এই তথ্যগুলো নিছক অনুমান নয়, বরং প্রামাণিক গবেষণার ফল, যা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যের সামগ্রিক চিত্র বুঝতে ২০১৯ সালে একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট বা এনআইএমএইচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় এই বৃহৎ পরিসরের জরিপটি সম্পন্ন করে।
এই জরিপটি কতটা ব্যাপক ও পদ্ধতিগত ছিল, তা এর পরিধি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় এবং এটিই একে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। মোট ৭ হাজার ২৭০টি খানা বা পরিবারকে এই জরিপের আওতায় আনা হয়েছিল, যা সারা দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি নমুনা হিসেবে কাজ করেছে। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এই তথ্য সংগ্রহের কাজটি চালানো হয়।
কবিরাজের কাছে ছুটে যাওয়ার প্রবণতা
চিকিৎসা-শূন্যতার পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো, যারা সাহায্য চাইতে যানও, তাদের অনেকেই সঠিক জায়গায় পৌঁছান না। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণা একটি চমকপ্রদ প্রবণতার দিকে আলোকপাত করেছে। দেখা যাচ্ছে, মানসিক সমস্যায় সাহায্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ মানুষই সবার আগে প্রথাগত চিকিৎসক বা কবিরাজের কাছে ছুটে যান, যা প্রকৃত চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটায়।
বাকিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা খোঁজার ধরনটিও যথেষ্ট বিভক্ত এবং তা সমস্যার গভীরতাকেই নির্দেশ করে বলে গবেষকরা মনে করছেন। জরিপ অনুযায়ী, সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে ৩১ শতাংশ মানুষ সাধারণ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, আর মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ সরাসরি একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যান। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে সঠিক সেবা সম্পর্কে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
বয়স্কদের নীরব সংকট ও করণীয়
এই সংকট সমাজের সব স্তরকে স্পর্শ করলেও কিছু জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যাদের কথা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিশেষভাবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশব্যাপী পরিচালিত এই খানা জরিপে বয়স্কদের মধ্যে মানসিক সমস্যার ব্যাপকতা এবং তাদের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান বিশাল চিকিৎসা-শূন্যতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, এই গবেষণাগুলো একটি বিষয়ই বারবার জোর দিয়ে বলছে, আর তা হলো সমন্বিত ও ব্যাপক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জরুরি প্রয়োজনীয়তা। এই বিশাল চিকিৎসা-শূন্যতা দূর করতে হলে কেবল হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত কুসংস্কার আর ভুল ধারণাগুলোকেও ভাঙতে হবে সমান গুরুত্ব দিয়ে।
মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই সমান গুরুত্ব দেওয়ার সময় এখন এসেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাই মিলে যদি এই নীরব যন্ত্রণাকে স্বীকৃতি দেয় এবং সহানুভূতির সঙ্গে পাশে দাঁড়ায়, তবেই কেবল লাখো মানুষের এই দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব করা সম্ভব হবে এবং একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনের পথ সুগম হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধিই এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে মনে করা হচ্ছে সর্বমহলে। মানসিক সমস্যাকে লজ্জা বা দুর্বলতা হিসেবে না দেখে, একে একটি চিকিৎসাযোগ্য অসুস্থতা হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে আমাদের সবার মধ্যেই। তাহলেই মানুষ নির্দ্বিধায় সঠিক চিকিৎসকের কাছে যেতে উৎসাহিত হবে এবং এই নীরব মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই সহজ হবে।






