আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব ২০২৬: পরিস্থিতি, সতর্কতা ও করণীয়
2026 সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ডেঙ্গুতে 13,098 জন আক্রান্ত ও 43 জনের মৃত্যু হয়েছে, আর হামে আক্রান্ত হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।
বাংলাদেশ 2026 সালে একই সঙ্গে একাধিক সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু এবং হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে, এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা 13,000 ছাড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুসারে, মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে 13,098 জন এবং এই রোগে মারা গেছেন 43 জন। আগের 24 ঘণ্টায় নতুন করে 458 জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং আরও 3 জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগ, যেখানে 3,002 জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে 2,270 জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে 1,869 জন এবং খুলনা বিভাগে 1,684 জন আক্রান্ত।
মৃত্যুর হারের দিক থেকেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে মোট 43 জনের মৃত্যুর মধ্যে 15 জনই মারা গেছেন এই এলাকায়। এই পরিসংখ্যান রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কতটা বেশি, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
হামের প্রাদুর্ভাব
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাবও দেশে গুরুতর আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত 15 মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে 123,753 জন, যাদের মধ্যে গবেষণাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা 15,442 জন। সংখ্যাটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
হামের কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই রোগে সব মিলিয়ে মোট 820 জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিত হওয়া রোগীদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে 95 জনের। এছাড়া সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত 106,239 জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে 102,467 জন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
ডেঙ্গুর লক্ষণসমূহ
ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। 2024 সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ডেঙ্গুর সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, যা প্রায় 94.3 শতাংশ রোগীর মধ্যে দেখা গেছে। এর পাশাপাশি মাথাব্যথা 70.3 শতাংশ এবং শরীরে ব্যথা বা মায়ালজিয়া 66.1 শতাংশ রোগীর মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়া পরিপাকতন্ত্র সম্পর্কিত লক্ষণও বেশ প্রকট। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় 49.9 শতাংশ রোগীর মধ্যে বমি বমি ভাব এবং 43.9 শতাংশ রোগীর মধ্যে পেটে ব্যথার উপসর্গ ছিল। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি
সব ডেঙ্গু রোগী সমান ঝুঁকিতে থাকেন না। গবেষণা অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় 65.6 শতাংশের ক্ষেত্রে বিপদচিহ্নসহ ডেঙ্গু দেখা গেছে, আর গুরুতর ডেঙ্গু হয়েছে প্রায় 9 শতাংশ রোগীর। গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা প্রায় 5.6 শতাংশে পৌঁছায়।
গুরুতর ডেঙ্গুর কিছু নির্দিষ্ট বিপদচিহ্ন রয়েছে, যেগুলোর দিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসাদ, হাত-পা ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, এবং শরীর থেকে রক্তরস বেরিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়া উচিত।
প্রতিরোধের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সারা বছরব্যাপী পরিকল্পিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। তবে দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে এখনো একটি কেন্দ্রীভূত ও সক্রিয় মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যা ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বাড়ির আশপাশে যেন পানি জমে মশার বংশবিস্তার না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখা, মশারি ব্যবহার করা এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর পরিণতি এড়ানো সম্ভব বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
সামনের চ্যালেঞ্জ
সব মিলিয়ে, একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের মতো দুটি বড় প্রাদুর্ভাব সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ, জনসচেতনতা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






