আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
বাংলাদেশে ২০২৬ সালে ডেঙ্গু ও হামের একযোগে প্রাদুর্ভাব, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে
বাংলাদেশে ২০২৬ সালে ডেঙ্গু ও হামের একযোগে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, আর সরকার ডেঙ্গুর টিকা প্রয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালে জনস্বাস্থ্য খাত এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটিতে একই সময়ে ডেঙ্গু জ্বর এবং হাম নামক দুটি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
একযোগে দুই রোগের প্রাদুর্ভাব
২০২৬ সালের ২৬ জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাবের সম্মুখীন হয়েছে। এই দুটি রোগের একযোগে বৃদ্ধি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সক্ষমতার ওপর প্রবল চাপ ফেলছে, কারণ উভয় ধরনের রোগীর জন্যই ভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজন হয়ে থাকে।
চিকিৎসকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ ডেঙ্গু এবং হাম উভয় রোগেই উচ্চ জ্বর এবং শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ির মতো একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। তবে দুটি রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায়, সঠিক রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির সর্বশেষ চিত্র

ডেঙ্গু পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময় পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট চার হাজার নয়শত জন সংক্রমিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে দুইশত বিশ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
আক্রান্তদের লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ষাট শতাংশই পুরুষ, আর বাকি চল্লিশ শতাংশ নারী। নতুন মৃত্যুর ঘটনাগুলো বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নথিভুক্ত হয়েছে।
গত বছরের ভয়াবহ চিত্র
চলতি বছরের সংখ্যাগুলো বিগত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতির গভীরতা কিছুটা বোঝা যায়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লক্ষ দুই হাজার আটশত একষট্টি জন, এবং এই রোগে মারা গিয়েছিলেন মোট চারশত তেরো জন মানুষ। এই তথ্য রোগটির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবগুলোর একটির সম্মুখীন হয়েছিল। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল তিন লক্ষ একুশ হাজার একশত ঊনআশি জন, এবং মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক হাজার সাতশত পাঁচ জনে। সে সময় মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক পাঁচ তিন শতাংশ।
২০২৩ সালের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রোগের ভৌগোলিক বিস্তার। সেবার প্রথমবারের মতো রাজধানী ঢাকার বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা শহরের ভেতরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। ঢাকার বাইরে আক্রান্ত ছিলেন দুই লক্ষ এগারো হাজার একশত একাত্তর জন, আর ঢাকা শহরের ভেতরে এই সংখ্যা ছিল এক লক্ষ দশ হাজার আটজন।
রোগের দীর্ঘ ইতিহাস
বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের ইতিহাস আসলে বেশ পুরনো। ১৯৬৫ সালে প্রথমবারের মতো এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, যা তখনকার সময়ে ঢাকা ফিভার নামে পরিচিত ছিল। এরপর ২০০০ সালে রোগটি নতুন করে ফিরে আসে এবং সে বছর প্রায় পাঁচ হাজার পাঁচশত একায়ন্ন জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
রোগের ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ডেন টু নামক ধরনটি প্রধান হয়ে ওঠে, যা মোট আক্রান্তের সত্তর দশমিক দুই শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী ছিল। এছাড়া রোগের মৌসুমি ধরনও বদলে গেছে, এখন সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
টিকা নিয়ে সরকারের অবস্থান
ডেঙ্গুর টিকা প্রয়োগের বিষয়ে সরকার একটি অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন যে, বর্তমান পর্যায়ে ডেঙ্গুর টিকা প্রয়োগ শুরু করা হবে না। তিনি উল্লেখ করেন যে এই টিকাটি এখনো বিশ্বের সীমিত কয়েকটি দেশেই কেবল ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং থাইল্যান্ডসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশেই কেবল এই টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় সরকার এই মুহূর্তে টিকা কার্যক্রম শুরু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সঙ্গে পরামর্শ করার পরিকল্পনা করছে।
প্রতিরোধই মূল হাতিয়ার
হামের ক্ষেত্রে সরকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে হাম রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণই প্রধান কৌশল, যার মধ্যে রয়েছে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশারি ব্যবহার এবং পূর্ণ হাতা পোশাক পরিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত ২০২৬ সালে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ডেঙ্গু ও হামের একযোগে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে।






