আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
অ্যান্টিবায়োটিকের বেপরোয়া ব্যবহারে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: যখন চেনা ওষুধ আর কাজ করে না
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের এক নীরব সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এক সময় যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো সাধারণ সংক্রমণ সহজেই সারিয়ে তুলত, সেগুলোর অনেকটিই আজ আর আগের মতো কাজ করছে না, আর এই বাস্তবতাই বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের সামনে একটি বড় ও নীরব ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
বাংলাদেশ গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পর্যবেক্ষণ করে আসছে, আর সেই পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে কিছু ব্যাকটেরিয়া এমন সব ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলছে যেগুলো এক সময় বেশ ভালোভাবেই কাজ করত।
কেন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মূলত তখন গড়ে ওঠে যখন ওষুধগুলো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি, ভুলভাবে বা অপ্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়, কারণ প্রতিবার ব্যবহারে সবচেয়ে দুর্বল ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায় আর টিকে থাকা শক্তিশালীগুলো ধীরে ধীরে ওষুধকে ফাঁকি দিতে শেখে।
বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা হলো নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়া, কারণ অনেক জায়গায় চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে সহজে অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়, ফলে মানুষ ঠান্ডা-জ্বরের মতো সমস্যাতেও প্রয়োজন ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করে ফেলে।
আরেকটি বড় ভুল হলো ওষুধের পূর্ণ কোর্স শেষ না করা, কারণ কিছুটা সুস্থ বোধ করলেই অনেকে ওষুধ বন্ধ করে দেন, অথচ এতে দুর্বল হয়ে টিকে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে ওষুধের প্রতি আরও বেশি প্রতিরোধী হয়ে যায়।
খামার ও গবাদিপশুর ভূমিকা
সমস্যাটি শুধু মানুষের ওষুধ ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়, কারণ হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খামারেও ব্যাপকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, আর অনেক ক্ষেত্রে তা রোগ সারানোর জন্য নয় বরং পশুর দ্রুত বৃদ্ধির জন্য দেওয়া হয়।
খামারে অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে, যা পরে খাদ্য, পানি ও পরিবেশের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, ফলে মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য এখানে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকে শুধু হাসপাতালের সমস্যা হিসেবে না দেখে কৃষি, খামার ও পরিবেশ মিলিয়ে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মোকাবিলা করা প্রয়োজন, নাহলে সমাধান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আহ্বান জানিয়েছেন যেন হাসপাতালগুলো অ্যান্টিবায়োটিক লেখার সময় নির্ধারিত মান ও নির্দেশিকা মেনে চলে, যাতে শুধু প্রকৃত প্রয়োজনেই এসব শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করা হয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমে আসে।
পাশাপাশি তাঁরা জোর দিয়ে বলছেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা জরুরি, কারণ যতক্ষণ যে কেউ দোকান থেকে সহজে এসব ওষুধ কিনতে পারবে, ততক্ষণ অপব্যবহার ঠেকানো কার্যত অসম্ভব হয়ে থাকবে।
সাধারণ মানুষ কী করতে পারে
সাধারণ মানুষের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, কেবল যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা এবং একবার শুরু করলে নির্ধারিত পুরো কোর্স নিয়ম মেনে শেষ করা, মাঝপথে নিজের সিদ্ধান্তে বন্ধ না করা।
একইসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে ঠান্ডা, সাধারণ জ্বর বা ভাইরাসজনিত অনেক অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজেই আসে না, তাই এসব ক্ষেত্রে ওষুধের জন্য জোরাজুরি না করে বিশ্রাম ও উপযুক্ত চিকিৎসার ওপর নির্ভর করাই বেশি নিরাপদ।
বিশ্বজুড়েই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকে আগামী দিনের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে এখন থেকেই সচেতন পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে অনেক প্রাণহানি ও চিকিৎসা ব্যয় এড়ানো সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।






