আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
শিশুর নীরব সংকট: বাংলাদেশে খর্বতা কমলেও কৃশতা বাড়ছে, উদ্বেগে পুষ্টিবিদরা
বিডিএইচএস ২০২২ অনুযায়ী দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বতা কমে ২৪ শতাংশে নেমেছে, কিন্তু কৃশতা ৮ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশ। গ্রাম-শহরের ব্যবধান এখনও প্রকট।
ডেঙ্গু কিংবা বায়ুদূষণের মতো দৃশ্যমান স্বাস্থ্য সংকটের আড়ালে বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে চলছে আরেকটি নীরব মহামারি—শিশুদের অপুষ্টি। প্রতিদিন লাখো শিশু পর্যাপ্ত ও সুষম খাবারের অভাবে বেড়ে উঠছে, আর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে গোটা জাতির ভবিষ্যতের ওপর।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একই সঙ্গে আশা ও উদ্বেগের ছবি আঁকে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে বা বিডিএইচএস ২০২২ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বতার হার ২৪ শতাংশ, কৃশতার হার ১১ শতাংশ এবং কম ওজনের হার ২২ শতাংশ। প্রতিটি সংখ্যার পেছনেই রয়েছে অসংখ্য শিশুর বাস্তব জীবন।
খর্বতা কমছে, কিন্তু কৃশতা বাড়ছে
খর্বতা বা স্টান্টিং বলতে বোঝায় বয়স অনুযায়ী শিশুর উচ্চতা কম হওয়া, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির লক্ষণ। এই সূচকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে—২০১৩ সালে যেখানে খর্বতার হার ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, ২০১৯ সালে তা নেমে আসে ২৮ শতাংশে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য।
এই অগ্রগতির ধারা পরবর্তী বছরগুলোতেও বজায় ছিল। ২০১৭-১৮ সালের ৩১ শতাংশ থেকে খর্বতার হার আরও কমে ২০২২ সালে দাঁড়ায় ২৪ শতাংশে। মায়েদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার প্রসার এবং সরকারি-বেসরকারি নানা পুষ্টি কর্মসূচির সম্মিলিত ফল হিসেবেই এই উন্নতিকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সব খবর স্বস্তির নয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে কৃশতা বা ওয়েস্টিং—অর্থাৎ উচ্চতা অনুযায়ী ওজন কম হওয়ার হার—৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশে পৌঁছেছে। কৃশতা তীব্র ও তাৎক্ষণিক অপুষ্টির ইঙ্গিত দেয় এবং এই বৃদ্ধি একটি বিপৎসংকেত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
একইসঙ্গে কম ওজনের শিশুর হার কোনো উন্নতি ছাড়াই ২২ শতাংশে স্থির রয়ে গেছে। অর্থাৎ, খর্বতা মোকাবিলায় সাফল্য এলেও তীব্র অপুষ্টির অন্য দিকগুলো এখনও অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক পুষ্টি পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে।
গ্রাম ও শহরের প্রকট ব্যবধান

দেশের ভেতরেও পুষ্টি পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে, বিশেষত গ্রাম ও শহরের মধ্যে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ শিশুদের মধ্যে খর্বতার হার ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ, কম ওজনের হার ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কৃশতার হার ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
তুলনায় শহরাঞ্চলের চিত্র কিছুটা ভালো হলেও তা সন্তোষজনক নয়। শহরের শিশুদের মধ্যে খর্বতা ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ, কম ওজন ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং কৃশতা ১৩ শতাংশ। এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগের অসমতা সরাসরি শিশুর পুষ্টিতে প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনের প্রথম এক হাজার দিন—অর্থাৎ গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত—পুষ্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের অপুষ্টি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে এমন ক্ষতি করে, যা পরবর্তী জীবনে আর পূরণ করা সম্ভব হয় না।
করণীয় ও ভবিষ্যতের পথ
অপুষ্টির চক্র ভাঙতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধুই মায়ের বুকের দুধ, এরপর সঠিক সময়ে পুষ্টিকর বাড়তি খাবার প্রদান এবং গর্ভবতী মায়ের যথাযথ যত্ন—এই সাধারণ কিন্তু কার্যকর অভ্যাসগুলোই অপুষ্টি প্রতিরোধের প্রথম সারির অস্ত্র।
পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধও পুষ্টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বারবার ডায়রিয়া বা সংক্রমণে আক্রান্ত শিশু খাবার খেলেও তা থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না, ফলে অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সরকারি নীতিনির্ধারকদের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—অগ্রগতিকে ধরে রাখতে হলে বিশেষ নজর দিতে হবে পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দিকে। লক্ষ্যভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মায়েদের শিক্ষা ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা কঠিন।
শিশুর অপুষ্টি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্তরায়। আজকের অপুষ্ট শিশু আগামীকালের দুর্বল কর্মশক্তি। তাই এই নীরব সংকটকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি, যাতে প্রতিটি শিশু সুস্থ ও পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।






