আয়েশা রহমানVIEW PROFILE →
নীরব ঘাতক অসংক্রামক রোগ: বাংলাদেশে ৭১ শতাংশ মৃত্যুর নেপথ্যে লুকানো লবণ, চিনি ও চর্বি
সংক্রামক রোগ নয়, বাংলাদেশে এখন প্রতি ১০টি মৃত্যুর ৭টিই ঘটছে অসংক্রামক রোগে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আর ক্যান্সারের এই ঢেউয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেট,আর তাই সমাধানের কেন্দ্রেও থাকতে হবে পুষ্টি।
এক সময় বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল নানা রকম সংক্রামক রোগ, কিন্তু সেই চিত্র আজ আমূল বদলে গেছে। এখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন কিছু রোগ, যেগুলো একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় না, অথচ ধীরে ধীরে নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে লাখো মানুষের প্রাণ, আর সমস্যার শিকড় লুকিয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেটেই।
সংখ্যাই বলে দিচ্ছে সংকটের গভীরতা
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশে এখন মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্যই দায়ী অসংক্রামক রোগ, অর্থাৎ প্রতি দশটি মৃত্যুর মধ্যে সাতটিই ঘটছে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখে। এই একটি পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়, দেশের জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার কতটা বদলে যাওয়া প্রয়োজন।
গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক ছবি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ডায়াবেটিসের সম্মিলিত হার প্রায় ৩১ শতাংশ, আর পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের ক্ষেত্রে এই হার লাফিয়ে পৌঁছে যায় প্রায় ৫২ শতাংশে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি যে কীভাবে বহুগুণ বেড়ে যায়, এই সংখ্যাগুলো তারই স্পষ্ট প্রমাণ বহন করছে।

নীরব কারণ লুকিয়ে আছে প্লেটে
এই মহামারির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে আমাদের বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবারে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত চিনি, মাত্রাতিরিক্ত লবণ এবং শিল্পভাবে তৈরি ক্ষতিকর চর্বির ব্যবহারই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আর ক্যান্সারের মতো রোগগুলোর দ্রুত বিস্তারের মূলে রয়েছে, অথচ বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা এখনো অনেক কম।
সমস্যার একটি বড় দিক হলো, এই উপাদানগুলো প্রায়ই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, ভাজাপোড়া কিংবা বাইরের নানা মুখরোচক খাবারে যে বিপুল পরিমাণ লবণ ও চিনি মিশে থাকে, তা আমরা সাধারণত টেরই পাই না, ফলে অজান্তেই প্রতিদিন শরীরে জমা হতে থাকে রোগের বীজ।
বিশেষ করে শিল্পভাবে উৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট বা ক্ষতিকর চর্বি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন। সস্তা এই চর্বি অনেক খাবারকে মুচমুচে ও দীর্ঘস্থায়ী করলেও, তা রক্তনালিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা প্রতিরোধযোগ্য হলেও এখনো ব্যাপকভাবে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক—না-জানা রোগ
অসংক্রামক রোগের সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো এর নীরবতা, কারণ অনেকেই জানেনই না যে তারা আক্রান্ত। গবেষণা বলছে, পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের প্রায় ৩৪ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও তা তাদের অজানা থেকে যায়, আর সব বয়স মিলিয়ে প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে তাদের শরীরে ডায়াবেটিস বাসা বেঁধেছে।
এই না-জানা অবস্থাটাই সবচেয়ে মারাত্মক, কারণ কোনো লক্ষণ ছাড়াই রোগটি ভেতরে ভেতরে হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলে। উপরন্তু দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ তুলনামূলক কম বয়সেই দেখা দিচ্ছে, যা আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধান
এই সংকট আর কেবল শহরের ব্যস্ত জীবনযাপনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামগঞ্জেও। পরিসংখ্যান বলছে, গ্রামাঞ্চলে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, আর আট শতাংশেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, যা এক সময় প্রধানত শহুরে রোগ হিসেবেই বিবেচিত হতো।
গ্রামীণ এলাকায় এই ভার আরও ভারী হয়ে ওঠে সীমিত স্বাস্থ্যসেবার কারণে, যেখানে নিয়মিত রক্তচাপ বা রক্তে শর্করা পরিমাপের সুযোগ অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়ে যায়, আর চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই অনেক সময় জটিলতা ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফেলে।
সমাধানের কেন্দ্রে থাকুক পুষ্টি
এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন—পুষ্টিকে রাখতে হবে স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও উন্নয়ন পরিকল্পনার একেবারে কেন্দ্রে। তাঁদের মতে, অপুষ্টি ও ভুল খাদ্যাভ্যাসের বিরুদ্ধে লড়াই না করলে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ থেকে শুরু করে একটি সহনশীল জাতি গড়ে তোলা—কোনোটিই সম্ভব হবে না।
ব্যক্তি পর্যায়েও পরিবর্তন আনা সম্ভব সহজ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে। খাবারে লবণ ও চিনির পরিমাণ কমানো, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খাওয়া, এবং নিয়মিত হাঁটাচলা করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সুরক্ষা এনে দিতে পারে।
সবশেষে সবচেয়ে জরুরি হলো নিয়মিত পরীক্ষা করানো, কারণ রোগ সময়মতো ধরা পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ। উপসর্গের অপেক্ষায় না থেকে বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা মেপে নেওয়ার অভ্যাসই পারে এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হয়ে উঠতে।






